Friday, 17 February 2017

বিদায় মানবেন্দ্র ! বিদায় ! /দিবাকর পুরকায়স্থ

বিদায় মানবেন্দ্র ! বিদায় ! /দিবাকর পুরকায়স্থ

"একদা.......... (ফাগুন ) দিনে
গভীর চরণে
নীরব নিষ্ঠুর সরণিতে
পাদস্পর্শ দিতে ভিক্ষুক মরণে
পেয়েছো পথের মাঝে
দিয়েছো অক্ষয় তব দান ,
হে বিরাট প্রাণ। ....."


যে যাত্রা কোন সেই সুদূর অতীতে এক মার নাড়িছেঁড়া বেদনা দিয়ে শুরু হয়ে ছিল তা আজ এক মহাযাত্রায় সমাপ্তি ঘটলো। কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রার মাঝের ইতিহাস ? বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সাথে হাসি কান্নার স্মৃতি বিজড়িত দিনগুলির ইতিহাস ? এক সাধারণ সভ্য থেকে অক্লান্ত পরিশ্রমী নায়কের সভাপতি পর্যন্ত উত্তরণের ইতিহাস ? আজ যতি টানবার আগে এই স্মৃতি তর্পনে তার কিছুটা যদি স্মরণ করার চেষ্টা করি তবে কি তোমরা শুনবে? কি বললে সবাই? শুনবে যদি চাও তোমরা, ঠিক আছে,তবে তাই হোক।
মানবেন্দ্র ভট্টাচার্য্য শিলঙ আসেন ১৯৬০ সালে।উনি প্রথম শিলচরের বাসিন্দা ছিলেন।সংস্কৃতিবান লোকেরা নিজস্ব সাহিত্য সংস্কৃতির খোঁজ সব জায়গায়ই পেয়ে যায়, মানবেন্দ্র বাবুর ও তাই বঙ্গীয় সংস্কৃতির সাহিত্য পরিষদের সাথে যোগযোগ হতে সময় লাগেনি। ১৯৬০ সালেই তিনি পরিষদের সাধারণ সভ্য হয়ে কাজকর্ম শুরু করে দেন। তাঁর প্রথম বৃহৎ কাজের শুরু রবীন্দ্র জন্ম শত বার্ষিকী দিয়ে। সেটা ১৯৬১ সাল।বিশাল আকারে পালিত হবে রবীন্দ্র জন্ম শত বার্ষিকী।এপ্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে তখনো পরিষদের নিজস্ব হল মঞ্চ ইত্যাদি হয়নি (পরিষদের নিজস্ব ভবন হয়েছিল ১৯৬৫ সালে, সে অন্য এক ইতিহাস ). সে সময় পরিষদের সম্পাদক ছিলেন শ্রদ্ধেয় কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য।  ( বিখ্যাত পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের শ্বশুর)সে যা হোক, সে সময় মানবেন্দ্র বাবু অন্যান্য কর্মী বৃন্দের সাথে অক্লান্ত ভাবে কাজ করে গেছেন।উপরোক্ত উৎসব স্টেট সেন্ট্রাল লাইব্রেরি হল এ অনুষ্টিত হয়।  ৮ ই মে ১৯৬১ তে সকাল ৯.৩০ টায় "জিতভূমি", সিডিলি হাউস এবং  ব্রুকসাইডতে স্মৃতি ফলক লাগানো থেকে শুরু করে মূল অনুষ্ঠান সব কিছুতেই তার উপস্থিতি ছিল। ৯ ই মে প্রভাত ফেরি করে নগর পরিক্রমাতে উনি অংশ নিতে পারেননি , কারণ তার নিজের জবানীতে সম্পাদক কুমুদ বাবু তাকে হলের প্রবেশদ্বারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।  তার পর ১৯৬৩ সালে স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম শত বার্ষিকী উদযাপনের বিরাট তোরণ মানবেন্দ্র বাবুই তৈরী করেছিলেন। ওই উৎসবে পৌরোহিত্য করেছিলেন রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী ভব্যানন্দ মহারাজ।

তারপর কুমুদ বাবুর যোগ্য নেতৃত্বে মানবেন্দ্র বাবু সাহিত্য পরিষদের  স্বর্ণযুগের ( সময়কাল ১৯৭৮ পর্যন্ত ) সর্বতোভাবে পরিষদ অন্ত প্রাণ ছিলেন এবং কুমুদ বাবু ১৯৭৩ সালে পাকাপাকিভাবে শিলঙ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মানবেন্দ্র বাবু বিজয় ভট্টাচার্য্য, সর্বজনশ্রদ্ধেয়া রানীদি (শোভনা গুপ্ত ), রাখাল ভট্টাচার্য, শ্যামাদাশ ভট্টাচার্য্য , বিভু ভূষণ চৌধুরী ,এবং আর বহু ( সবার নাম এখানে সঙ্গত কারণে নিলামনা) সভ্য দের সাথে সাহিত্য পরিষদ চালনা করে নিয়ে গেছেন। এরই মধ্যে শংকর দেব কলেজের বাংলার অধ্যাপকের দ্বায়িত্ব সমানভাবে চালিয়ে গেছেন অবহেলা না করে।

তারপর এলো ক্রান্তিকাল। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামার পর সাহিত্য পরিষদ শরণার্থী শিবিরে পরিণত হলো। ( এসব কথা আমি বিস্তৃত ভাবে আমার লেখা  লগ আউট নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়াতে ব্যক্ত করেছি, এমনকি মানবেন্দ্র বাবুর উপর একটা অধ্যায় যুক্ত করেছি ) ১৯৮৬ সালের এক দুপুর থেকে মানবেন্দ্র বাবু তার শ্রেষ্ট কর্ম কান্ড শুরু করেন।শরণার্থী শিবিরে পরিণত পরিষদের তখন সঙ্গিন অবস্থা। এই অবস্থা থেকে সাহিত্য পরিষদের পুনরুত্থানের যে বিশাল এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের ইতিহাস তা মানবেন্দ্র বাবুর জন্য সম্ভব হয়েছে। অবশ্য সঙ্গে উনি যোগ্য সঙ্গত পেয়ে ছিলেন আফজাল হোসেন, অমিয় কুমার সামন্ত, পীযুষ ধর, যশোধীর শ্যাম, আশুতোষ গুপ্ত প্রমুখ আরো অনেককে।কিন্তু তখন থেকেই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মানবেন্দ্র বাবু।ততদিনে ধীরে ধীরে বিভিন্ন পদে উন্নীত হয়ে উনি পরিষদের সভাপতি হন এবং এই গুরু দ্বায়িত্ব সহজভাবেই চালিয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে।সাহিত্য পরিষদের ত্রৈমাসিক পত্রিকা "কর্মশালার " র তিনি ছিলেন উদ্ভাবক যা আজ ভালো ভাবে চলছে। 
উনি একাধারে ছিলেন শিক্ষক, ঐতিহাসিক, ভাষা বিজ্ঞান ও লিপি গবেষক। উত্তর পূর্ব ভারতের শাশ্বত সমাজে উনি এক অতি পরিচিত নাম। শিলঙ থেকে প্রকাশিত " শ্রীহট্ট-কাছাড়ের প্রাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃতির রূপরেখা " গ্রন্থের তিনি ছিলেন অন্যতম সম্পাদক। বরাক-সুরমা উপত্যকার ইতিহাস এবং প্রাচীন তাম্রলিপির কাল নির্ণয় তার গবেষণার বিষয় ছিল।প্রাচীন সাহিত্য থেকে ইতিহাসের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।   
ব্যক্তিগত জীবনে উনি স্ত্রী আর  প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত দুই পুত্র নিয়ে খুবই সুখী ছিলেন।
শেষ করার আগে একটা কথা না বললে এই স্মৃতি চারণ অপূর্ণ থেকে যাবে।আমি উত্তর পূর্বাঞ্চল, বিশেষত শিলঙের উপর বই লেখার আগে শিলঙের বিশিষ্ট, শিক্ষিত সমাজের প্রতিভূ বলে পরিচিত অনেকের কাছেই তথ্য চাইতে গেছি , কিন্তু অনেকেই নানা কারণ দেখিয়ে সাহায্য করা থেকে বিরত থেকেছেন কিন্তু মানবেন্দ্র বাবু অসুস্থ শরীরে আমাকে বহু তথ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন এবং তারজন্য আমি তাঁর কাছে চিরঋণী থাকবো।    

আমি আজ মর্মাহত। শুধু সুকান্ত ভট্টাচার্য্য র কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলাম তাঁর লেখা একটা শব্দ সময়োপযোগী বদলানোর ধৃষ্টতা করার জন্য।

No comments:

Post a Comment