Friday, 25 March 2022

চরৈবেতি


চরৈবেতি......


রবিঠাকুর প্রচন্ড গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে শরীর ঠান্ডা করার জন্য শিলং গেছিলেন। আর আমরা কাশ্মীরী গরমে অতিষ্ঠ হয়ে,  ঠান্ডা হবার তাগিদে বাইরে যাওয়া মনস্ত করি।

গত কদিন‌ থেকে কাশ্মীরী গরম দিকে দিকে যা উত্তাপ ছড়াচ্ছে, তাতে সেদ্ধ হবার বাকী ছিল। শেষ অব্দি জ্বর না এসে যায় !

তাই ঠান্ডা হতে ভগবান বুদ্ধের দ্বারস্থ হবার বাসনা নিয়ে সোজা অজন্তা গুহামণ্ডলে গিয়ে ভগবান বুদ্ধের চরণে প্রণিপাত।

চড়াই আর উৎরাই ভীষণ  খাড়া পাকদণ্ডী। তদুপরি ৩৭°গরমে পাহাড়ের পাথর রোদ পড়ে তেতে উঠলেও যেই গুহার ভেতরে ভিক্ষু শ্রেষ্ঠ বুদ্ধ ভগবানের দরবারে প্রবেশ,অমনি চারপাশ ঠান্ডা আর অমনি হৃদয় পেল এক  অপরিসীম পরিপূর্ণতা ।

বুদ্ধং শরণং গচছামি।

ভগবান তথাগতর পাঁচটি ধ্যানীরূপ যথা অমিতাভ, বৈরোচন,রত্নসম্ভব, অমোঘসিদ্ধি আর অভোক্ষ্য।

অবলোকিতশ্বর অথবা বুদ্ধ কপাল আর পান্ডারা

ওঁ মনিপদ্মে হ্রুং। 

সৃষ্টির মূল‌রহস‌্য। পুরুষ এবং প্রকৃতি।আলি আর কালি । মণি আর পদ্ম। হ্রুং মানে মন্থন। ব্যাখ‌্যা নিষ্প্রয়োজন।

শায়িত পৃথিবী  বিখ্যাত the dying princes 

দেয়ালের চিত্রগুলিতে বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। ফ্রেস্কো ধাঁচের এই দেয়ালচিত্রগুলোর জীবন্তরূপ এবং এগুলো তে নানা রঙের সমৃদ্ধ ও সূক্ষ্ম প্রয়োগ এগুলোকে ভারতের বৌদ্ধ চিত্রশিল্পের সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শনে পরিণত করেছে।

পাথর কেটে খোদাই করা প্রায় ৩০টি গুহা-স্তম্ভ। এগুলো খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এগুলোতে পাওয়া ছবি ও ভাস্কর্য, তৎকালীন বৌদ্ধধর্মীয় শিল্পের উৎকৃষ্ট নিদর্শন। 

কোথায় কাশ্মীর আর কোথায় গরম ? এখানে কোনো তর্ক বিতর্কের স্থান নেই। নেই কোনো আগুন হাওয়া, নেই জ্বর, নেই কোনো কিছু ।

পরম শান্তি । এক গভীর প্রশান্তির অনুভব।

ভগবান তথাগতের চরণে মন প্রাণ অর্পণ করলাম ।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে আর আমরা ফিরি আমাদের সরাই এ ।


                                                                                      ****


পরদিন আবার এক সুন্দর  সকাল। এবার চলেছি আরেক গুহা মন্ডলীতে। ইলোরা । পথে পড়লেন দেবাদিদেব মহেশ্বর, ঘৃষ্ণেশ্বর। দ্বাদশজ্যোতি লিঙ্গের শেষ লিঙ্গ। সমগ্র মন্দির লাল পাথর দিয়ে তৈরি। এর পাঁচটি চূড়া আছে। এই মন্দির অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত। কথিত আছে, ভগবান শিব এক মাকে তাঁর মৃত সন্তানকে ফিরে পেতে সহায়তা করেছিলেন এবং সেই মা ও গ্রামবাসীদের অনুরোধে শিব সেখানে জ্যোতির্লিঙ্গরূপে অবস্থান করেন। পূজা পারলাম।

এবার যাত্রা ইলোরা। ভারতের শিলা কেটে কোনো কিছু তৈরি করার প্রাচীন প্রতিরূপ স্থাপত্যটি এখানে অণুসৃত হয়েছে। এখানে মোট ৩৪টি গুহা রয়েছে যেগুলো চরনন্দ্রী পাহাড়ের অভ্যন্তর থেকে খনন করে উদ্ধার করা হয়েছে। গুহাগুলোতে হিন্দু, বৌদ্ধ এবংজৈন ধর্মের ভাস্কর্যের স্বাক্ষর রয়েছে। ৫ম থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যে এই ধর্মীয় স্থাপনাগুলি তৈরী হয়েছিল। এখানে বৌদ্ধ ধর্মের ১২টি, হিন্দু ধর্মের ১৭টি এবং জৈন ধর্মের ৫টি গুমফা রয়েছে।  ১৬ নম্বর গুহাটি  সর্ববৃহৎ। নাম কৈলাশ।না, লালমোহন বাবুর মত লাশ দেখার দুর্ভাগ্য হয়নি, সৌভাগ্য ও হয়নি ফিল্ম শুটিং দেখার।

সর্ব ধর্মের উপাসনালয়ের এই সহাবস্থান সে যুগের ভারতবর্ষে ধর্মীয় সম্প্রীতির নিদর্শন বহন করে, যা আজ বিলুপ্তপ্রায়। প্রাচীন রাষ্ট্রকুট রাজবংশ এই স্থাপত্য গুলো নির্মাণ করেছেন।


                                                                                     ****


চরৈবেতি চরৈবেতি!


ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সেই বিখ্যাত শ্লোকের অংশ বিশেষ। মানে অনবরত এগিয়ে চলা।জীবনের পথে এগিয়ে চলা ছাড়া উপায় নেই। এগিয়ে চললাম। এবারে লক্ষ্য খুলতাবাদ।ভারতের শেষ সম্রাট (আক্ষরিক অর্থে নন) বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন শাসনতন্ত্রের পুতুল মাত্র। তার সময় সাম্রাজ্য দিল্লি এবং আশপাশ অব্দি বর্তমান ছিল। আমি বলছি সত্যিকার আ সমুদ্র হিমাচলের শেষ সম্রাট আলমগীর বাদশাহ ঔরঙ্গজেব এর কথা।১৭০৬ সাল থেকে পরম প্রশান্তিতে এখানে শুয়ে আছেন এক অতি সাধারণ মাজারে।ওনার নিজের ফরমান ছিল যে ওনাকে সমাধিস্থ করতে ১৪ টাকা বারো আনার বেশী যেন খরচ না করা হয়। সাধারণ মানূষের মতো যেন ওনাকে কবর দেয়া হয় এবং কোনো রাজকীয় খরচ করতে বারণ করেন।লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে মাজার ঢাকা, পাশের অংশে ওনার  প্রিয় পুত্র শাহ আলম শায়িত।

এই ঠান্ডা পরিবেশ থেকে ধীরে ধীরে  বেরিয়ে আসি। খাবার খেয়ে আবার পথ চলা।এবার লক্ষ্য দৌলতাবাদ।

                                       ****              

সুলতান মহম্মদ বিন তোঘলক। 

ইতিহাস ওনাকে মনে রেখেছে ‘পাগলা রাজা’ নামে। কিন্তু উনি আক্ষরিক অর্থে পাগল ছিলেন না যদিও ওনার কিছু কিছু সিদ্ধান্ত হয়ত সঠিক ছিল না।ওনার রাজত্বকালীন চতুর্দশ শতকে সমগ্র ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ছিল। কিন্তু ১৩২৭ সনে উনি কোনা বি্শেষ কারণ ছাড়াই রাজধানী দিল্লি থেকে দক্ষিণ ভারতের দেবগিরিতে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই যুগে হাজার হাজার সৈন্য সামন্ত, লোকলস্কর, হাতী ঘোড়া ইত্যাদি লটরবটর নিয় সমস্ত জনসাধারণ সহ দেবগিরি চলে আসেন এবং দেবগিরির নুতন নামকরণ করেন দৌলতাবাদ।যদিও দৌলতাবাদ মাত্র বছর সাতেক ভারতের রাজধানী ছিল। ইতিমধ্যে রাজার মোহভঙ্গ হয় এবং ১৩৩৪ সালে ফের দিল্লি ফিরে যান অবশ্যই সব সঙ্গীসাথী নিয়ে। এখন‌ সেই দৌলতাবাদ দুর্গ ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।দুর্গ ভারতীয় সর্বেক্ষণ বিভাগে্য অধীনে সুসজ্জিত। সারি সারি প্রাচীন কামান দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাছাড়া  সুসজ্জিত বাগান, প্রকান্ড লোহার উঁচু দরজা যা দিয়ে এককালে হাতী ও হাওদা ঢুকে  পড়ত তারা আজ মূক  ইতিহাসের সাক্ষী। মজার কথা  এই দৌলতাবাদ দুর্গের সিংহ দরজার উল্টো দিকে সদম্ভে দাঁড়িয়ে ‘হোটেল দেবগিরি’ সৌভাতৃত্বের প্রচার করছে। দৌলতাবাদ ছেড়ে এবার ঔরঙগাবাদ শহরের দিকে যাত্রা।লক্ষ্য ‘বিবি কা  মকবারা’।

                                       *****

বিবি কা মকবারা অর্থ নারীরা স্মৃতি সৌধ। আলমগীর বাদশাহ ঔরঙ্গজেব ওনার মৃত পত্নী দিলরাসবানু বেগম (রাবিয়া-উদ-দুরাণী) এর স্মৃতিতে এই সৌধ নির্মাণ করেন ১৬৬০সনে। এই অপরূপ স্মৃতি সৌধ আগ্রার তাজমহলের হুবহু প্রতিচ্ছবি যেন।তার জন্য এই সৌধ ‘দাক্ষিণাত্যের তাজমহল’ নামে সমধিক পরিচিত।  সৌধের দরজায় উৎকীর্ণ নাম আতাউল্লাহ এবং হনসপত রাই যথাক্রমে মূখ্য স্থপতি এবং মূখ্য প্রকৌশলী। এই আতাউল্লাহ আবার তাজমহলের মূখ্য স্থপতি ওস্তাদ আহমেদ লাহৌরীর পুত্র ছিলেন। পরবর্তীতে আওরঙ্গজেবের পুত্র আজম শাহ এই সৌধের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতেন। বিবি কা মকবারা দেখার পর ঔরঙগাবাদ শহরের‌ কিছু বর্ণনা দিই। ঔরঙগাবাদকে ‘সিটি অব গেইটস’ বলা হয়। এই শহরের চারদিকে মোট বাহান্নটি গেট বা দরওয়াজা ঘিরে ছিল। অনেক গেট সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। এই প্রাচীন শহরটিকে ভারতীয় সংরক্ষণ বিভাগের আওতায় এনে যাকিছু অবশিষ্ট আছে সেগুলো ভালভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। এছাড়া শহরের মূল অংশে ভগবান তথাগত বুদ্ধের নামে ‘সিদ্ধার্থ গার্ডেন’ দর্শনীর স্থান।

নাম =ঔরঙগাবাদ

স্থপতি= মালিক অম্বর

সাল= ১৬১০





মোট এলাকা =১৩৯ বর্গ কিঃ মিঃ

১৯.৮৮° উত্তর (অক্ষ রেখা)

৭৫.৩২ পূর্ব (দ্রাঘিমা রেখা)

পিন: ৪৩১০০১

আবহাওয়া : সর্বোচ্চ ৩৮°

বাতাসের আর্দ্রতা ২০% 

জেলা = ঔরঙগাবাদ


সরকারী ভাষা= মারাঠী

কিভাবে যাবেন : ঔরঙগাবাদ সব বড় বড় নগরী/মহানগরীর সাথে রেল এবং বিমানসেবা দ্বারা যুক্ত ।

কোথায় থাকবেন:

সব রকমের হোটেল আছে।তাজ গ্রুপের ভিভনত তাজ ছাড়া রামাদা, অজন্তা এম্বেসেডার,লেমন ট্রি আদি উচ্চ শ্রেণীর এবং সাধারণের সাধ্যের মধ্যে হোটেল ঔরঙগাবাদ,সেভেন আপেল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।


                                 ---------0---------


No comments:

Post a Comment